লন্ডন - মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরান যখন পাল্টা জবাব দিয়েছে, তখন হঠাৎ করেই শান্তির পক্ষের দেশগুলো যেন নতুন করে চিন্তিত হয়ে উঠেছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্য ইরানের জবাবকে 'অসামঞ্জস্যপূর্ণ' (disproportionate) বলে আখ্যা দিয়েছে । কিন্তু প্রশ্ন হলো, সামঞ্জস্যপূর্ণ জবাবটা কী হওয়া উচিত ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলে এক নতুন তত্ত্বের অবতারণা করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জার্মান কূটনীতিক বলেন, "দেখুন, আন্তর্জাতিক আইনের একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে। যে দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নয়, তাদের কর্তব্য হলো নির্ধারিত ভাগ্য মেনে নেওয়া। ইরানের উচিত ছিল নীরবে এই আঘাত সইয়ে দেওয়া। এটাই হবে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ।"

তিনি আরও বলেন, "ইরান যদি মনে করে যে তারাও আত্মরক্ষার অধিকার ভোগ করবে, তাহলে তো আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় একটা কথা আছে—মার খাবে তবেই বাঁচবে।"

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, "ফ্রান্স, জার্মানি ও আমরা একসঙ্গে যে বিবৃতি দিয়েছি, তার মূল বক্তব্য হলো ইরান কেন অযথা জবাব দিতে গেল? ওদের তো বোঝা উচিত ছিল, ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বে ইরানের ভূমিকা কেবল লক্ষ্যবস্তু হওয়ার। লক্ষ্যবস্তু যদি পাল্টা আঘাত করে, তাহলে সেটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।"

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, "কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তো ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে। তাহলে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার কোথায়?"

জবাবে ওই কর্মকর্তা হাসতে হাসতে বলেন, "আত্মরক্ষার অধিকার? ওরা কি ভুলে গেছে যে ওরা ইরান? ইরান যদি আত্মরক্ষা করে, তাহলে আর আমাদের কী বাকি থাকে? আমরা তখন ইরানের ওপর আরও নিষেধাজ্ঞা দেব, আরও হুমকি দেব। ওদের উচিত চুপচাপ বসে থাকা। এটাকেই বলে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা।"

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ অবশ্য আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, "আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করি ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জনে বাধা দেওয়ার জন্য" । তিনি ইরানকে 'অস্থিতিশীলতার উৎস' বলেও অভিহিত করেছেন। তবে ইরানের ওপর হামলা নিয়ে কোনো সমালোচনা না করে তিনি বরং ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও একই সুরে বলেন, "ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস" । তবে মার্কিন হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে তিনি ইরানের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাইয়া ক্যালাস ইরানের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেছেন, "ইরানের শাসকরা হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে" । তবে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার বিষয়ে তিনি কোনো নিন্দা জানাননি।

এদিকে, রাশিয়া ও চীন এই পরিস্থিতিকে 'আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী' বলে আখ্যা দিয়েছে । রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, "এটি একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও উসকানিমূলক সামরিক আগ্রাসন" ।

নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেছেন, "ইসরায়েলের এই হামলা প্রতিরোধমূলক আক্রমণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নয়। প্রতিরোধমূলক আক্রমণের জন্য তাৎক্ষণিক ও নিকটবর্তী হুমকির প্রয়োজন" ।

কিন্তু এই মন্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত হিসেবে দেখা দিলেও মূল সুরটা থেকে যায়—ইরানের উচিত জবাব না দেওয়া। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, "আমি দৃঢ়ভাবে সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি" ।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন ব্যাখ্যায় বলা যায়—পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু দেশের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। বাকিদের কর্তব্য হলো নিজ নিজ ভাগ্য মেনে নেওয়া। ইরান যদি এই ভাগ্য মেনে নিত, তাহলে আজ ইউরোপের নেতাদের এত মাথাব্যথা থাকত না।