ঢাকা - বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার নেতা মাহদী হাসানের সাম্প্রতিক দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে দুই সংবাদমাধ্যমের দুই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা, অন্যদিকে বাংলাদেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট। দুই মাধ্যমের প্রতিবেদনে তথ্যের বিরোধ দেখা যায়। এই বিতর্কের মূলে রয়েছে সাংবাদিকতার মৌলিক কিছু নীতিমালা লঙ্ঘনের প্রশ্ন। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিধায় নীল দর্পণ বিষয়টি বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণী
মাহদী হাসান গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের দিল্লিতে যান ইউরোপের একটি দেশের ভিসা সংক্রান্ত কাজে। ১৭ ফেব্রুয়ারি দিল্লির ভিএফএস সেন্টারে গেলে সেখানে কেউ একজন তার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এর আগে বাংলাদেশে একটি থানায় বসে পুলিশ কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তিনি বিতর্কিত ছিলেন। দিল্লিতে অবস্থানকালে তার অবস্থান জানাজানি হয়ে গেলে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং পরে ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আসেন।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের মূল দাবি ও বিশ্লেষণ
২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে ভারতের দুই অজ্ঞাতনামা গোয়েন্দা কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়:
- মাহদী হাসান ও তার আত্মীয় পর্তুগালের ভিসা নিতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে সরাসরি লিসবনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
- মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি পাহাড়গঞ্জের হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে উঠেন।
- তার কাছে ৪০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ক্রিপ্টো-কারেন্সি ছিল, যা তিনি খরচের জন্য নিয়ে এসেছিলেন।
- ভারতীয় কর্মকর্তারা তাকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ না করলেও বুঝিয়ে দেন যে "ভারত-বিরোধী কথা বলা এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করা কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না।"
- তার ভারতীয় ভিসা রাতেই বাতিল করে দেওয়া হয় এবং ইন্ডিগোর বিমানের টিকিট পৌঁছে দেওয়া হয়।
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, তারা মাহদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতা: বিবিসি বাংলা মূলত দুইজন ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করেছে, যাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। এই দুই সূত্রের স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নিজস্ব এজেন্ডা থাকতে পারে - তারা তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে বা নিজেদের অনুকূলে ঘটনা উপস্থাপন করতে আগ্রহী হতে পারেন। বিবিসি বাংলা সেই সম্ভাবনা আমলে নেয়নি বলে প্রতীয়মান হয়। তবে বিবিসি বাংলার পক্ষে একটি ইতিবাচক দিক হল, তারা মাহদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল এবং তা উল্লেখ করেছে। যদি দুই সূত্র স্বাধীন হয় এবং একে অপরের তথ্য নিশ্চিত করে, তাহলে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। কিন্তু সূত্রের নাম গোপন রাখার কারণে সেই স্বাধীনতা যাচাই করা সম্ভব নয়।
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনের মূল দাবি ও বিশ্লেষণ
২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলার তথ্য ভুয়া দাবি করে বলা হয়:
- মাহদী হাসান পর্তুগাল নয়, বরং ফিনল্যান্ডের ভিসার জন্য আবেদন করেছিলেন। তারা মাহদীর ভিসা আবেদনপত্রের কপি সংগ্রহ করে দেখিয়েছে।
- ১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) রাতে তিনি বিমানবন্দরের কাছের কোনো হোটেলে ওঠেননি, বরং তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর বাসায় ভাসান্ত বিহারে অবস্থান করেন। সেখান থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার পর ওলা ক্যাবসের মাধ্যমে বিমানবন্দরে যান।
- ক্রিপ্টো-কারেন্সি সংক্রান্ত তথ্য ভুয়া এবং এটি আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট 'Amar Habiganj' নামের একটি ফেসবুক পেইজ প্রথমে এডিটেড স্ক্রিনশট দিয়ে ছড়ায়।
- দাবিকৃত ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্টের স্ক্রিনশটটি ফটো ফরেনসিক টুল দিয়ে বিশ্লেষণ করে এডিট করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
- মাহদী ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ৩৯ মিনিটে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে তার পাসপোর্টের কপি পাঠান, যা পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতা: দ্য ডিসেন্ট বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের তথ্য চ্যালেঞ্জ করলেও তারা নিজেরাও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে। তাদের প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে - অর্থাৎ বিবিসি বাংলা, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ হাইকমিশন - তাদের কারো কাছ থেকে বক্তব্য নেওয়া হয়নি। বিবিসি বাংলার কাছে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চাওয়া, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বক্তব্য নেওয়া, অথবা বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট লিকের বিষয়ে জানতে চাওয়া - এসব কিছুই দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে অনুপস্থিত। ফলে দ্য ডিসেন্ট নিজেও একপাক্ষিক প্রতিবেদনই উপস্থাপন করেছে।
কদরুদ্দিন শিশিরের ফেসবুক পোস্ট: দ্বৈত মানের অভিযোগ
সাংবাদিক কদরুদ্দিন শিশির তার ফেসবুক পোস্টে দ্য ডিসেন্টের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিবিসি বাংলার সমালোচনা করেছেন। তিনি লেখেন:
"আমাদের মতো ছোটখাটো সাংবাদিকরাও কোন ঘটনায় --বিশেষ করে যেখানে কারো বিরুদ্ধে এলিগেশন আছে-- সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নিতে না পারলে অনেক কষ্ট করে তৈরি করা স্টোরি আটকে দেই। কিন্তু জুলাই আগস্ট সংশ্লিষ্ট একটা ছেলের বিরুদ্ধে নামহীন গোয়েন্দা সূত্র থেকে কিছু অভিযোগ পেয়ে বিবিসি বাংলার আর তর সইছিলো না। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে কল করে না পেয়েই রিপোর্ট ছেড়ে দিয়েছে, জাস্ট নামহীন একপক্ষের দুটি গোয়েন্দা সূত্রে বরাত দিয়ে। খুব তাড়া! অথচ এখন দেখা যাচ্ছে ওই নামহীন সূত্রের দেয়া একদম মৌলিক তথ্যগুলোও অসত্য।"
শিশিরের বক্তব্যের অসঙ্গতি: শিশিরের এই মন্তব্যে রয়েছে দ্বিমুখী নীতি (double standard) এবং সাংবাদিকতার নীতির প্রতি অসম্মান। তিনি অভিযোগ করেছেন বিবিসি বাংলা মাহদী হাসানের বক্তব্য না নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দ্য ডিসেন্ট কি বিবিসি বাংলা, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অথবা বাংলাদেশ হাইকমিশনের বক্তব্য নিয়েছে? যাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছে - ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে 'ভুয়া তথ্য দেওয়ার' অভিযোগ, বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিরুদ্ধে 'পাসপোর্ট লিকের' অভিযোগ - তাদের কারো বক্তব্য কি দ্য ডিসেন্ট নিয়েছে? না। তাহলে শিশিরের এই অভিযোগ নিজেদের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেই ফিরে আসে।
শিশির বিবিসি বাংলাকে 'ছোটখাটো সাংবাদিক' পর্যায়ের নিচে নামিয়ে এনে সমালোচনা করলেও, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে বিবিসি বাংলার নিজস্ব সোর্স ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া রয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া যে শতভাগ নির্ভুল, তা নয় - যেমনটি দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে দেখা গেছে। কিন্তু অন্যদিকে দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনও একপাক্ষিক থেকে গেছে।
দুই প্রতিবেদনের মধ্যে মৌলিক তথ্যের বিরোধ দেখা গেছে। বিবিসি বাংলার নামহীন সূত্রের দেওয়া তথ্য - বিশেষ করে পর্তুগাল ভিসা এবং বিমানবন্দরের কাছে হোটেলে ওঠার দাবি - দ্য ডিসেন্টের উপস্থাপিত প্রমাণের আলোকে ভুল বলে প্রতীয়মান হয়। ক্রিপ্টো-কারেন্সি সংক্রান্ত তথ্যও এডিটেড স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে ছড়ানো হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
কিন্তু দ্য ডিসেন্ট বিবিসি বাংলার ভুল তথ্য চিহ্নিত করলেও, তারা নিজেরাও সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বক্তব্য না নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা একপাক্ষিক সাংবাদিকতারই নামান্তর। কদরুদ্দিন শিশিরের বিবিসি বাংলার সমালোচনা নিজেদের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য - যা তিনি উপেক্ষা করেছেন।
সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী, কোনো ঘটনায় অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই মানদণ্ডে বিবিসি বাংলা, দ্য ডিসেন্ট - উভয় সংবাদমাধ্যমই অকৃতকার্য হয়েছে। বিবিসি বাংলার উচিত দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনের আলোকে তাদের তথ্য পুনর্মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনী প্রকাশ করা। অন্যদিকে দ্য ডিসেন্টের উচিত বিবিসি বাংলা, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের বক্তব্য নিয়ে একটি ফলো-আপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
সাংবাদিকতা সত্যের সন্ধান দেয়, কিন্তু একপাক্ষিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কোনো সংবাদমাধ্যমই ভুলের উর্ধ্বে নয়, এবং সত্য উদঘাটনের জন্য সব পক্ষের বক্তব্য শোনা অপরিহার্য।