ঢাকা - রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাংবাদিকদের ওপর ‘ভুলবশত’ লাঠিচার্জ করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়া রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম এখন টক অফ দ্য টাউন। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে খিলগাঁওয়ে এক কিশোরকে ‘অক্ষত’ উদ্ধার করে তিনি খলনায়কের তকমা ঝেড়ে ফেলে এক ত্রাণকর্তার ইমেজে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে এই নাটকীয় ভোলবদলে জনমনে যতটা না স্বস্তি ফিরেছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে পুলিশের ‘স্ক্রিপ্ট রাইটিং’ দক্ষতা নিয়ে।

ঘটনার শুরু গত সোমবার সন্ধ্যায়। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে ডিসি মাসুদের অধীনস্থ পুলিশ সদস্যরা। বাংলানিউজের তোফায়েল আহমেদসহ একাধিক সংবাদকর্মীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও লাঠিচার্জ করা হয়। ঘটনার পর ডিসি মাসুদ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে জানান যে, সাংবাদিকদের গলায় ‘প্রেস কার্ড’ ঝুলানো ছিল না বলেই এই সামান্য ভুল বোঝাবুঝি। তার যুক্তি অনুযায়ী, কার্ড না থাকলে পিটুনি খাওয়াটা এক প্রকার ‘নৈমিত্তিক’ ঘটনা।

কিন্তু এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার বিকেলে মঞ্চস্থ হয় এক অভাবনীয় উদ্ধার অভিযান. সচিবালয়ের এক কর্মচারীর অপহৃত ছেলেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করেন সেই একই ডিসি মাসুদ। অপহরণকারীরা ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ চেয়েছিল, যা ডিসি মাসুদের দুর্ধর্ষ দরকষাকষিতে মাত্র ১০ হাজারে নেমে আসে। পুলিশের এই অভাবনীয় ‘ডিসকাউন্ট’ পাওয়ার কৌশলে মুগ্ধ সাধারণ মানুষ। তবে মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তি ব্যবহার করে অবস্থান শনাক্ত করা এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযান চালানো হলেও কোনো অপহরণকারীকে ধরা সম্ভব হয়নি। তারা পুলিশের উপস্থিতি ‘টের পেয়ে’ সময়মতো সটকে পড়তে সক্ষম হয়।

এই অলৌকিক উদ্ধার অভিযানের পর সুশীল সমাজের একটি অংশ ডিসি মাসুদের অপসারণের দাবি তুললেও সরকারি মহল থেকে তাকে ‘সৎ ও দক্ষ’ অফিসারের সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের দাবি, সোমবারের সাংবাদিক পেটানোর কলঙ্ক মুছতেই এই ‘ অপহরণ ও উদ্ধার’ নাটক সাজানো হয়েছে। কোনো গ্রেফতার ছাড়া মুক্তিপণ ১০ হাজারে নামিয়ে আনা এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের বিষয়টি মূলত ডিসি মাসুদকে বাঁচানোর একটি ‘সেফ প্যাসেজ’ বলে অনেকে মনে করছেন।

এই সাজানো নাটকের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসি মাসুদ আলম অত্যন্ত শান্তভাবে জানান, তারা অত্যন্ত সততার সাথে কাজ করছেন এবং এসব অভিযোগ অমূলক। তার মতে, পুলিশ এখন আর আগের মতো নেই, এখন কাজের চেয়ে ‘ফলাফল’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া কিশোরের বাবার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তার নিরবতা অনেক না বলা কথা বলে দিচ্ছে।

নয়া বন্দোবস্তের এই নতুন জমানায় পুলিশ একই সাথে মারবে এবং মলম লাগাবে—এটাই এখনকার স্বাভাবিক সংস্কৃতি। সাংবাদিকরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও ডিসি মাসুদের ‘হিরোইজম’ এখন সরকারি নথিতে উজ্জ্বল হয়ে শোভা পাচ্ছে।