দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক টানাপোড়েন চলছিল। একদিকে সাবেক এমপি ও তারকা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, অন্যদিকে বিসিবির নীতিনির্ধারকরা। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশ বদলে গেছে, সরকার বদলে গেছে, আর বদলে গেছে ক্রিকেট বোর্ডের চেহারাও। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরই গুঞ্জন শুরু হয়েছিল—সাকিব কি আবারও নীল জার্সিতে মাঠে ফিরবেন? অবশেষে সেই গুঞ্জন সত্যি হতে চলেছে। তবে ফেরার কারণটা হয়তো অনেকেই জানেন না।
নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে জাতীয় দলে ফেরার চেষ্টা করছেন সাবেক এই ক্রিকেটার। তবে গতকাল রাজধানীর এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাকিবের ফেরার কারণ শুনে হতবাক সাংবাদিকরা। স্পট বেটিংয়ে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাই খোলাখুলি জানিয়ে দিলেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সাকিব বলেন, “আমি পেশাদার ক্রিকেটার। আমার একটা পরিবার আছে, স্ত্রী-সন্তান আছে। গত কয়েক বছরে ম্যাচ ফিক্সিং আর বেটিং করে যা ইনকাম করছিলাম, সেটা ছিল ভালোই। কিছু টাকা আমি একটা অনলাইন বেটিং সাইটেও ইনভেস্ট করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে যখন আমাকে দল থেকে বাদ দেওয়া হলো, তখন আমার আয় বন্ধ হয়ে গেল। সংসার চলে না ভাই।”
তিনি আরও বলেন, “আমি যদি মাঠে থাকি, তাহলে আমি স্পট বেটিং করতে পারব। উইকেটের পিচ দেখে, কন্ডিশন দেখে, কোন ওভারে কত রান হবে, কবে বোলার পরিবর্তন হবে—এটা আমি খুব ভালো বুঝি। ফিল্ডিংয়ে থেকে এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাই। এটাই এখন আমার ইনকামের শেষ পথ।”
উল্লেখ্য, স্পট বেটিং বা ইন-প্লে বেটিংয়ে খেলার নির্দিষ্ট মুহূর্তে বাজি ধরার সুযোগ থাকে। আর সেই সুযোগটাই মাঠে থেকে নিতে চান সাকিব, এমনটাই দাবি তার।
এদিকে, সাকিবের এই আকস্মিক দাবির পর মুখ খুলেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক আসিফ আকবর। তিনি সাকিবের বক্তব্যের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়ে বসেছেন।
আসিফ আকবর সাংবাদিকদের বলেন, “সাকিব শুধু একজন ভালো প্লেয়ার না, সে একটা ব্র্যান্ড। ওর যদি বেটিং করার ইচ্ছা থাকে, তাতে সমস্যা কোথায়? দেখুন, ক্রিকেটাররা সারা বছর এত পরিশ্রম করে, অথচ তাদের আয় সীমিত। সরকারের উচিত বেটিং বৈধ করা। তাহলে সাকিবের মতো খেলোয়াড়রা মাঠে থেকেও বাড়তি ইনকাম করতে পারবে। এতে দেশের জিডিপি বাড়বে, প্লেয়ারদের মরাল বুস্ট হবে, আর ক্রিকেটও হবে ইন্টারেস্টিং। তিনটে বোনাস পয়েন্ট!”
তিনি আরও যোগ করেন, “বেটিং বৈধ হলে আমরা বিসিবি থেকেও একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করতে পারি। সেখানে স্পট বেটিং-এর পাশাপাশি ‘কে ম্যাচ সেরা হবে’, ‘কে কত রান করবে’—এসব নিয়েও বাজি ধরার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে তুলবে।”
বিসিবির এই পরিচালকের বক্তব্যে অবশ্য ক্রিকেট মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একজন সিনিয়র সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ওরা যেন ভুলেই গেছে, সাকিব তো আগেই বেটিংয়ের দায়ে আইসিসির কাছ থেকে নিষেধাজ্ঞা খেয়েছিল। এখন আবারও সেই একই কাজ করতে চাইছে মাঠে থেকে। আর বিসিবি পরিচালক বলছেন, এটা ক্রিকেটের উন্নয়ন! নীল দর্পণের পক্ষে এটাকে আমরা ‘ক্রিকেটীয় মুনাফাবাদ’ ছাড়া আর কিছু বলতে পারছি না।”
প্রসঙ্গত, নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সাকিবের জাতীয় দলে ফেরা নিয়ে জল্পনা চলছিল। যদিও অনেক সচেতন মহল মনে করছে, এভাবে বিতর্কিত ক্রিকেটারকে ফিরিয়ে আনলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ণ হবে। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? সাকিবের সংসার চালাতে হবে, আর আসিফ আকবরের ‘ক্রিকেটীয় অর্থনীতি’ চাঙ্গা করতে হবে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, বিসিবির জরুরি সভায় সাকিবের ফেরার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। শিগগিরই বিসিবি সভাপতি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন বলে শোনা যাচ্ছে।