বরিশাল - বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মঙ্গলবার বিকেলে এক নজিরবিহীন ‘গণতান্ত্রিক’ হট্টগোল সম্পন্ন হয়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুসকে নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়ার অপরাধে ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা এজলাসে ঢুকে বিচারকার্য বাধাগ্রস্ত করেন। আইনজীবীদের দাবি—জামিনযোগ্য ধারা হোক বা না হোক, কার জামিন হবে আর কার হবে না, তা ঠিক করার দায়িত্ব তাদেরই; আদালত এখানে কেবল একটি সাক্ষী বা দস্তখত দেওয়ার মেশিন মাত্র।

ঘটনার শুরু মঙ্গলবার সকালে, যখন জেলা আইনজীবী সমিতির অধিকাংশ সদস্য জামিন বাতিলের দাবিতে আদালত বর্জন করে বিক্ষোভে নামেন। এর আগে সোমবার বিস্ফোরক মামলার আসামি ইউনুস সাহেব আত্মসমর্পণ করে ‘অযাচিতভাবে’ জামিন পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। এই ঘটনায় আইনজীবীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। তাদের মতে, যেখানে জেলা জজ আদালত ছাড়া এসব মামলায় জামিন পাওয়ার কথা নয়, সেখানে নিম্ন আদালত কেন নিজ উদ্যোগে আইন মানতে গেল, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এজলাসে হট্টগোলের বিষয়ে আইনজীবী সমিতির একজন প্রভাবশালী সদস্য নীল দর্পণকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, "আদালতকে বুঝতে হবে তারা কার কথায় চলবে। আমরা মামলা আনব, আমরাই ঠিক করব কার বিচার হবে আর কে জামিন পাবে। আদালত শুধু আমাদের সিদ্ধান্তে সিল মারবে। কিন্তু ইদানীং আদালত আমাদের কথার বাইরে যাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে, তাই আমাদের বাধ্য হয়ে এজলাসে ঢুকে এই ‘সংশোধনী’ কার্যক্রম চালাতে হয়েছে।"

বার কাউন্সিলের একজন শীর্ষ নেতা বিষয়টিকে আরও মানবিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "ইদানীং আইনজীবীদের আয় অনেক কমে গেছে। মামলার চাকা না ঘুরলে আমাদের পকেটও ঘোরে না। যদি আদালত আমাদের পরামর্শ ছাড়া এভাবে হুটহাট জামিন দিয়ে দেয়, তবে মক্কেলরা আমাদের গুরুত্ব দেবে কেন? আমাদেরও তো সংসার আছে, আমাদেরও তো টাকার দরকার। জামিন প্রক্রিয়াটা আমাদের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত।"

এদিকে দিনভর আদালত বর্জনের কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন। আদালত চত্বরে বসে থাকা এক বিচারপ্রার্থী এই অচলাবস্থা দেখে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, "বার অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা যদি এতই বুঝেন, তবে তারা নিজেরাই আলাদা কোর্ট বসিয়ে দিতে পারেন। জজ সাহেবদের আর কষ্ট করার দরকার নেই। আইনজীবীরা নিজেরাই বাদী, নিজেরাই বিবাদী আর নিজেরাই বিচারক হলে আমাদের মতো গরিব মানুষের ফয়সালা অন্তত দ্রুত হতো।"

ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সিআইডি এসে ‘আলামত’ সংগ্রহ করলেও হট্টগোলের নায়ক আইনজীবীদের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, তারা কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, বরিশালের আদালত পাড়ায় ‘আইন’ তার নিজস্ব গতিতে নয়, বরং আইনজীবীদের ‘ইচ্ছার’ গতিতে চলার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।