বাংলার বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য দুঃসংবাদ। সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে এখন থেকে শুধুমাত্র আইনজীবী ও তাদের সহকারীরাই প্রবেশ করতে পারবেন। গত ২০ জানুয়ারি জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তবে আপিল বিভাগের পাশাপাশি হাইকোর্টের সব বেঞ্চেও এই নিয়ম কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে।

এই নির্দেশনা কার্যকর হলে সাংবাদিকরা আদালতের কার্যক্রম কভার করতে পারবেন না। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, মামলার বাদী-বিবাদীরাও জানতে পারবেন না তাদের মামলার কী অবস্থা। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, "আদালত হচ্ছে আইনজীবী ও বিচারকদের পবিত্র স্থান। এখানে অন্যের কী দরকার? আইনজীবীরা এখানে এসে তর্ক করবেন, বিচারক শুনবেন, রায় দেবেন। এই প্রক্রিয়ায় বাইরের কারও হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।"

এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, "কিন্তু মামলার সঙ্গে জড়িত ক্লায়েন্টরা যদি আদালতে না আসতে পারেন, তাহলে তারা তাদের আইনজীবীর সঙ্গে কীভাবে কথা বলবেন? তাদের ইনপুট ছাড়া তো মামলা চলে না!"

জবাবে ওই কর্মকর্তা বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, "ক্লায়েন্টের ইনপুটের কী দরকার? তারা তো আইন বোঝেন না। আইনজীবীরা যা করবেন, তাই ঠিক। তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেবেন, উকিল নাম্বারি খাটাবেন, মক্কেলকে পরে জানিয়ে দেবেন। মক্কেলের কাজ শুধু ফি দেওয়া। এটাই আধুনিক আইনি ব্যবস্থা।"

আরেক সাংবাদিক এই নিষেধাজ্ঞাকে স্বেচ্ছাচারিতার পর্যায়ে ফেলে দেওয়ার কথা বললে ওই কর্মকর্তা আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। তিনি বলেন, "দেখুন, সুপ্রিম কোর্ট একটা পাঁচতারা হোটেলের মতো। এখানে কে ঢুকবে, কে ঢুকবে না, সেটা আমরা ঠিক করব। পাঁচতারা হোটেলে কি সবাই ঢোকে? ঢোকে না। সেখানে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ ঢোকে। তেমনি আমাদের আদালতও একটা অভিজাত স্থান। এখানে শুধু আইনজীবী ও বিচারকদের মতো অভিজাত শ্রেণির মানুষেরই প্রবেশের অনুমতি থাকবে। সাধারণ মানুষের জন্য আছে নিম্ন আদালত। ওখানে গিয়ে তারা মামলা মোকাবেলা করবেন।"

এদিকে, প্রধান বিচারপতির এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুই দফা চিঠি দিয়েছে ল রিপোর্টার্স ফোরাম। কিন্তু কোনো সুরাহা না হওয়ায় হতাশ সাংবাদিকরা। ল রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি বলেন, "আমরা মনে করি, বিচার কেবল হওয়াই যথেষ্ট নয়, তা যেন জনগণ দেখতে পায়, সেটাও জরুরি। কিন্তু এই নির্দেশনা সেই মৌলিক নীতির পরিপন্থী।"

প্রধান বিচারপতির এই নির্দেশনা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে—আইনজীবীরা যদি মক্কেল ছাড়াই মামলা চালিয়ে যান, তাহলে বিচার কী সত্যিই বিচার থাকবে? নাকি আইনজীবী ও বিচারকদের একান্তই নিজস্ব এক 'অভিজাত ক্লাব' হয়ে উঠবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট?

প্রাচীন প্রবাদ বলে, 'শুধু বিচার হওয়াই যথেষ্ট নয়, বিচার যেন হয়েছে বলেও প্রতীয়মান হয়।' কিন্তু এই নতুন নিয়মে বিচার হয়েছে বলেই বা কে জানবে?