স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া যায় একবার—এটাই ছিল এদেশের সাধারণ মানুষের ধারণা। কিন্তু সম্প্রতি সরকার প্রমাণ করে দিল, সাধারণ মানুষের ধারণা আর সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকতে পারে। চলতি বছরের স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম দেখে প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, বুঝি ১৯৭৭ সালের পুরোনো তালিকা ভুল করে আবার ছাপা হয়ে গেছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এটি কোনো ভুল নয়, বরং সরকারের স্মরণশক্তির এক অনন্য নিদর্শন।
১৯৭৭ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অবদানের জন্য ডা. জাফরুল্লাহ প্রথমবার এ পুরস্কার পান। ২০২৫ সালে সমাজসেবায় অবদানের জন্য তিনি দ্বিতীয়বার পেতে যাচ্ছেন। অর্থাৎ একই মানুষ, একই পুরস্কার, কিন্তু দুটি ভিন্ন দশক। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদে বৈঠক ডাকা হলো। কেউ কেউ বললেন, "ভুল হয়ে গেছে, নামটা বাদ দিই।" কিন্তু আরেক পক্ষ বললেন, "বাদ দিলে তো দেখে শুনে মজা নেবে বিরোধী দল। বরং এমন কিছু করি, যাতে ভুলটাই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।"
শেষ পর্যন্ত সেই দলটাই জিতল। রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক আদেশে স্বাধীনতা পুরস্কার সংক্রান্ত নির্দেশাবলির ৭.১১ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়েছে। নতুন বিধানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার পর অন্য কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখলে অন্তত ২৫ বছর পর তাকে পুনরায় এ পুরস্কার দেওয়া যাবে।
সংশোধিত অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, "আগে যা ছিল, সেটা ছিল ভুল। এখন যা হলো, সেটা সঠিক। আর ভবিষ্যতে কেউ যদি প্রশ্ন তোলে, আমরা বলব, '২৫ বছর তো পেরিয়ে গেছে, আপত্তি কী?'"
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদের এক কর্মকর্তা নীল দর্পণকে বলেন, "দেখুন, আমাদের হাতে সময় কম ছিল। জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাহেবের নাম তো তালিকায় চলে গেছে। এখন সেটা বাদ দিলে জনগণ কী ভাববে? তারা ভাববে, আমরা ভুল করেছি। আর আমরা ভুল করেছি—এটা ভাবার সুযোগ আমরা কাউকে দিতে চাই না। তাই আমরা ভুল শোধরানোর বদলে নিয়ম শোধরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটাকে বলে অ্যাডভান্সড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।"
তিনি আরও জানান, নতুন নিয়ম তৈরি করতে গিয়ে তারা ঐতিহাসিক একটি সূত্র মেনে চলেছেন। সেটি হলো—'ভুল যদি ঢাকতে হয়, তবে নিয়ম বদলে দাও। নিয়ম বদলালে ভুল বলে কিছু থাকে না, থাকে শুধু নতুন নিয়ম।'
এদিকে নতুন নিয়ম ঘোষণার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসব। অনেকেই বলছেন, এবার তাঁদেরও সুযোগ এসেছে। গতবার পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু মনে আছে? মনে না থাকলেও ২৫ বছর পর আবার দেওয়া যাবে। এক ব্যবসায়ী বললেন, "আমি তো গত বছর স্বাধীনতা পুরস্কার পাইনি। কিন্তু আমার বাবা ১৯৮০ সালে পেয়েছিলেন। এখন তাঁর নাম আবার দেওয়া যাবে কি না, সেটা ভাবছি। নিয়ম তো বলে, ২৫ বছর পর অন্য ক্ষেত্রে। আমার বাবার 'অন্য ক্ষেত্র' ছিল খেলাধুলা। এবার তাঁকে 'সমাজসেবা' ক্যাটাগরিতে দেওয়া যায় কি না, দেখছি।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এ প্রসঙ্গে বলেন, "দেখুন, এটি খুবই বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত। একই মানুষ ২৫ বছর পর বদলে যায়। তাঁর চিন্তাভাবনা বদলে যায়, কাজের ধরন বদলে যায়। তাই তাঁকে আবার পুরস্কার দেওয়াটা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। যেমন ধরুন, ১৯৭৭ সালে জাফরুল্লাহ চৌধুরী সাহেব হয়তো জনসংখ্যা বাড়তে দেখে ছিলন। ২০২৫ সালে তিনি জনসংখ্যা কমতে দেখেও চিন্তিত। কাজেই দুটো ভিন্ন ভাবনা, ভিন্ন ক্ষেত্র।"
নিয়ম সংশোধন প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, "এটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এখন থেকে স্বাধীনতা পুরস্কার নিয়ে কেউ আর প্রশ্ন তুলতে পারবে না। কারণ প্রশ্ন তুললেই আমরা বলে দেব, '২৫ বছর আগের কথা আলাদা, এখনকার কথা আলাদা। আপনি কি ২৫ বছর আগের মানুষ আর এখনকার মানুষকে একই মনে করেন?' এই প্রশ্নের জবাবে সাধারণত কেউ কিছু বলতে পারে না।"
প্রসঙ্গত, স্বাধীনতা পুরস্কার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ১৯৭৭ সালে এই পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত একই ব্যক্তিকে দুইবার এ পুরস্কার দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। তবে নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এটি শেষবার নাও হতে পারে। কারণ ২০৫০ সালে এসে যদি কেউ বলেন, "জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে আবার দেওয়া হবে?", তখন সরকার যদি চায়, বলতে পারবে—'২৫ বছর তো পেরিয়েছে, আর ওনার তৃতীয় ক্ষেত্রও পাওয়া গেছে।'
এদিকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মরণোত্তর এ পুরস্কার পাচ্ছেন বলে তাঁকে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই। তবে স্বর্গে বসে তিনি যদি এ খবর পান, তাহলে হয়তো মুচকি হাসবেন। আর হয়তো ভাববেন, "আমার জন্য নিয়ম বদলাতে গিয়ে এত কষ্ট করলেন? একবার দিলেই তো হতো।"