বাংলাদেশ পুলিশের নতুন মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির সাংবাদিকদের উদ্দেশে এক অভূতপূর্ব আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলে সেটা নিয়ে মাথা ঘামানো থেকে বিরত থাকতে। কারণ, পুলিশকে অপরীদের শনাক্ত করতে যতটুকু সময় দরকার, তা না দিলে পুলিশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যায় এবং তখন তদন্তের নামে 'নাটক' বানাতে বাধ্য হয়।
সোমবার পুলিশ সদর দফতরে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এসে আইজিপি সাহেব সাংবাদিকদের বুঝিয়ে বলেন, "আপনারা যদি খুব প্রেশার দেন, তাহলে কিন্তু আমাদের মেন্টাল প্রেশার বেড়ে যায়। আর তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আমরা যেটুকু পাই, তাই নিয়ে একটা স্বীকারোক্তি বানিয়ে ফেলি। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ওই 'জজ মিয়া নাটক'।"
২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মামলায় জজ মিয়ার তৈরি স্বীকারোক্তির কথা তুলে ধরে আইজিপি সাহেব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, "দেখেন, তখন মিডিয়ার এত প্রেসার ছিল যে আমরা বাধ্য হয়ে একজন নিরীহ লোককে ধরে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে তাকে দিয়ে সাজানো স্বীকারোক্তি আদায় করি। ওটাকে আমরা এখন 'জজ মিয়া নাটক' বলি। বুদ্ধিজীবীরা বলেন ওটা নাকি 'নাটক' ছিল। কিন্তু ওটা ছিল মিডিয়া প্রেশারের ফল। আপনারা যদি চাপ না দিতেন, আমরা আস্তে আস্তে তদন্ত করতাম, তাহলে আসল অপরাধীদের ধরতাম কি না ধরতাম, তবে অন্তত জজ মিয়ার জীবনটা নিরীহ মানুষের মতোই কাটত।"
পুলিশ প্রধানের ভাষ্য, সম্প্রতি একটি সড়কে মাদক কেনাবেচা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। এই ধরনের ঘটনায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবলে পুলিশের মুশকিলে পড়তে হয়। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, "আমাদের রেসপন্স টাইম দিতে হবে। কোনো হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে ২০-২৫ বছর লেগে যায়, সেটা তো আপনারা জানেন। আমরা ২০ বছর পর গিয়ে দেখতে পাই, আসামি তখন বৃদ্ধ হয়ে মারা গেছে। এতে আমাদের কী লাভ? তাই তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।"
আইজিপি আরও জানান, তারা এখন একটি "মাস্টার প্ল্যান" নিয়ে কাজ করছেন। এই প্ল্যান অনুযায়ী, কোনো গুরুতর অপরাধ ঘটলে প্রথম ৪৮ ঘণ্টা সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে যেতে পারবেন না, যাতে পুলিশ শান্তিতে বসে "গল্প" তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে, পুলিশ নিশ্চিত করবে যে আসামি পুলিশের পছন্দমতো স্বীকারোক্তি দিয়েছে কিনা। আর তৃতীয় পর্যায়ে, আদালতে পাঠানোর আগে আসামিকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হবে যে মিডিয়াকে কিছু বললে জজ মিয়ার মতো তার কাহিনীও 'নাটক' আখ্যা পাবে।
তিনি সাংবাদিকদের প্রতি আরও একবার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, "আপনারা শুধু সহযোগিতা করেন। আমরা যখন দেখি, কোনো সৎ লোককে ধরে নিয়ে এসেছি, তখন আপনারা চিৎকার শুরু করে দেন। এতে আমাদের বিবেক কাঁদে। আমরা চাই, অপরাধী শনাক্তের নামে আমরা যা খুশি তাই করতে পারব, আর আপনারা সেটা 'গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত অগ্রগতি' বলে ছাপবেন। তাহলেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।"
কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাস দমনে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি সাহেব সাংবাদিককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, "আপনি কি আপনার বাবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবেন? নাহ পারেন না। তাহলে আমাদের ওপর এত চাপ দেন কেন?" তিনি আরও জানান, দেশের যুব সমাজ যাতে বেকারত্বের কারণে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পুলিশ থানা চত্বরে নিয়মিত 'বেকার সমাবেশ' আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, যাতে তারা বিক্ষোভে না গিয়ে থানায় এসে আড্ডা দিতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গ উঠলে আইজিপি সাহেব দাবি করেন, তিনিও ওই আন্দোলনে রাস্তায় ছিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, "জুলাই বিপ্লব কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না। কিন্তু আমরা দেখছি, অনেক লোক তখন রাস্তায় ছিল না, এখন বড় জুলাই বিপ্লবী সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদের ব্যাপারে আমরা সিরিয়াস। আমরা এদেরকেও শনাক্ত করে তালিকা করছি। ওই তালিকা তৈরি হয়ে গেলে আমরা এদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করব, ইনশাল্লাহ।"
পোশাক পরিবর্তন প্রসঙ্গে আইজিপি জানান, খাকি পোশাকে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সরকার ভাবছে। তবে তার আগে পুলিশের জন্য একটি নতুন 'অদৃশ্য পোশাক' আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে অপরাধ সংঘটনের সময় পুলিশকে দেখতে না পায় সাংবাদিকরা। তাহলে আর প্রেশার দিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারবে না, 'কোথায় ছিলে পুলিশ?'
প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে গ্রেপ্তার বা নাটক বানানোর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে নীল দর্পণ সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ প্রধানের এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক মহলে নতুন করে 'মেন্টাল প্রেশার' তৈরি হয়েছে—পুলিশ যাতে অপরাধ না করেই ফেললে তাদের ভুল ধরতে হবে কিনা, তা নিয়ে।