ঢাকা - ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির হঠাৎ মৃত্যুতে শোকাহত মুসলিম বিশ্ব। তবে এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন এক বিতর্ক। গতকাল রাজধানীতে এক বিক্ষোভ মিছিল বের করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, যেখানে অভিযোগের তীর ছোড়া হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) দিকে।
মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা 'খোমেনির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে', 'বিএনপি ইরান বিরোধী শক্তির দোসর' ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়। তবে সবচেয়ে চমকপ্রক ঘটনা ঘটে পরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে জামায়াতের আমির নিজেই বিএনপিকে সরাসরি দায়ী করেন ইরানি নেতার মৃত্যুর জন্য।
আমির তার লিখিত বক্তব্যে বলেন, "ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির মৃত্যু একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল। আমরা মনে করি, এই হত্যাকাণ্ডের সাথে বাংলাদেশের বিএনপি জড়িত। তারা মোসাদ ও সিআইএ-এর স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে এবং এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে।"
আমিরের এই বক্তব্যে সাংবাদিকরা একযোগে প্রশ্ন ছুড়ে দেন—ইরানের নেতার মৃত্যুর সাথে বিএনপির কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা তো দূরের কথা, এই ঘটনার সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাত থাকতে পারে বলে তো বিশ্বজুড়ে ধারণা। তাহলে জামায়াত সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দোষারোপ না করে বিএনপিকে দায়ী করছে কেন?
এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির হেসে বলেন, "আপনি খুব ভালো প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু দেখুন, আমরা জামায়াতে ইসলামী। আমরা কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী। কুরআনে স্পষ্ট বলা আছে, 'যে কাজ করবে, তাকে তার ফল ভোগ করতে হবে।' এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তো গায়েবি শক্তি না। তারা কাজ করে স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে। আর বিএনপি হলো তাদের সেই স্থানীয় এজেন্ট। তাই যিনি অস্ত্র চালিয়েছেন, তাকেই তো দোষ দিতে হবে।"
আমিরের এই যুক্তি শুনে আরেক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, "আপনি কি তাহলে মনে করেন, শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই খোমেনির মৃত্যুর জন্য দায়ী?"
জবাবে আমির মাথা নাড়িয়ে বলেন, "একদমই না। আমরা মনে করি না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল কোনোভাবে দায়ী। তাদের তো আমরা দেখতেও পাই না। আমরা দেখতে পাই বিএনপিকে, তাদের নেতা-কর্মীদের। কাজেই তারাই দায়ী।"
সাংবাদিকদের একজন তখন জিজ্ঞেস করেন, "কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলো তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখে এবং তাদের নীতিকেও সমর্থন করে। আপনারা তাদের সম্পর্কে কী মনে করেন?"
এই প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, "উপসাগরীয় দেশগুলো আমাদের বড় ভাই। তারা মুসলিম দেশ, আরব দেশ। তারা যা করে, তা আল্লাহর ইচ্ছাতেই করে। আমরা তাদের অনুসরণ করি। তারা কখনো ভুল করতে পারে না। তারা যদি আমেরিকা-ইসরায়েলকে সমর্থন করে, তাহলে তার মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো কল্যাণ আছে, যা আমরা বুঝি না। কিন্তু বিএনপি তো আরব দেশ না। তারা স্থানীয় দল। তারা আমেরিকার সাথে সরাসরি যোগসাজশ করে ইরানের নেতা হত্যায় অংশ নিয়েছে। এটা আমাদের কাছে সম্পূর্ণ পরিষ্কার।"
জামায়াতের এই বক্তব্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে হাসির রোল পড়ে গেলেও কেউ কেউ একে 'যুক্তির মৃত্যু' বলে আখ্যা দিয়েছেন। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়, "এটা হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক অভিনব ব্যাখ্যা। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতের বদলে শুধু ছায়াকে দোষ দেওয়া হচ্ছে, আর আরব ভাইদের সব অন্যায়কে চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।"
উল্লেখ্য, জামায়াতের এই মিছিল ও বিবৃতির পর বিএনপি এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দলটির একজন মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "ওরা আমাদের নাম না নিয়ে কিছু বললেই বাঁচে। আমাদের নাম নিয়ে কিছু বললে আমরা মামলা করার কথা ভাবব। আর ইরানের নেতার মৃত্যু নিয়ে ওদের এত ভাবনা দেখে মনে হয়, ওরা শিগগিরই ইরানে গিয়ে শোক পালন করতে চায়।"
প্রসঙ্গত, আয়াতুল্লাহ আলী খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানে ছয় দিনের শোক পালন করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জামায়াত এই শোককে কেন্দ্র করে দেশীয় রাজনীতিতে নতুন ইস্যু তৈরি করার চেষ্টা করছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।