জাতীয় সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের স্মরণে আনা শোকপ্রস্তাবের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্ব। সংসদে 'কিলার ইন দা পার্লামেন্ট' স্লোগান দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, "আওয়ামী লীগ খারাপ গণহত্যাকারী আর জামায়াত ভালো গণহত্যাকারী—এই দুটোর মধ্যে অনেক তফাৎ। এইটাই নয়া বন্দোবস্ত।"
গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ সম্প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন, যারা নিজেদের 'ফ্যাসিবাদবিরোধী' ও 'জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার বাহক' দাবি করেন, তারা কেন শুধু রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে 'খুনি' আখ্যা দিয়ে থেমে গেলেন? কেন তারা শুধু আওয়ামী লীগের 'গণহত্যা'র কথা বলেন, অথচ জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ ও একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ? এই নীরবতা কি তাদের ঘোষিত 'ইনক্লুসিভ' রাজনীতির সঙ্গে যায়?
সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের মুখে নাহিদ ইসলাম আরও স্পষ্ট করে বলেন, "আপনারা কি আওয়ামী লীগ আর জামায়াতকে এক কাতারে ফেলতে চান? এটা হবে ইতিহাসের চরম অপলাপ। আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালে যে গণহত্যা করেছে, সেটা খারাপ গণহত্যা। আর জামায়াত ১৯৭১ সালে যা করেছে, সেটা ভালো গণহত্যা—কারণ ওরা তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে ছিল, সেটা ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপট। এখন আমরা চাই সব গণহত্যাকারীকে এক সঙ্গে বিচারের আওতায় আনতে। কিন্তু তার মানে এই না যে সব গণহত্যা এক রকম।"
এ সময় সাংবাদিকরা জানতে চান, সংসদে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের জন্য শোকপ্রস্তাব পাসের সময় এনসিপি সদস্যরা কেন শুধু রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, শোকপ্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি? উত্তরে নাহিদ ইসলাম বলেন, "ওটা ছিল প্রটোকলের ব্যাপার। আমরা চেয়েছিলাম দেখতে, কারা এই শোকপ্রস্তাবের পক্ষে আর কারা বিপক্ষে। দেখা গেল, সবাই পক্ষে। তার মানে দাঁড়ায়, সবাই মিলেই ন্যায়বিচারের এই নয়া সংস্করণে একমত। আমরা শুধু 'নট কিলার' বলে চিৎকার করে নৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করেছি।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই অবস্থান 'ইনক্লুসিভ' রাজনীতির এক নতুন সংস্করণ উন্মোচন করেছে। যেখানে আওয়ামী লীগের 'খারাপ গণহত্যা' আর জামায়াতের 'ভালো গণহত্যা'র মধ্যে পার্থক্য করার ফর্মুলা দেওয়া হয়েছে। এই ফর্মুলা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীরা এখন 'সম্ভাব্য ভালো গণহত্যাকারী' আর ২০২৪ সালের গণহত্যাকারীরা 'খারাপ গণহত্যাকারী' হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এ বিষয়ে জামায়াতের আমিকার সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা তো সব সময়ই বলেছি, ১৯৭১ সালে আমরা ভুল করেছিলাম। এখন আমরা সেই ভুল শুধরে নিতে চাই। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো এখনও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কাজেই ভালো-খারাপের তুলনা তো স্পষ্ট। আমাদের 'ভালো গণহত্যা'র ইতিহাস এখন ইতিহাসের পাতায়, আর আওয়ামী লীগের 'খারাপ গণহত্যা' তাজা সংবাদ।"
এদিকে, আওয়ামী লীগের একাংশ এই ফর্মুলায় তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, "গণহত্যা আবার ভালো-খারাপ হয় নাকি? আমরা তো বুঝতে পারছি না, নতুন এই রাজনৈতিক দলটা কোন পথে হাঁটছে। ওরা যদি মনে করে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ 'ভালো গণহত্যা', তাহলে ওদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।"
এনসিপির তরুণ নেতাকর্মীরা এই ফর্মুলাকে 'বাস্তবসম্মত' বলে অভিহিত করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবেশে দলের এক নেতা বলেন, "সব গণহত্যা কি এক রকম? আপনি কি আওয়ামী লীগের ২০২৪ সালের বর্বরতা আর ১৯৭১ সালের 'রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা'কে এক করে দেখতে পারেন? না, পারেন না। সেটাই আমরা বুঝাতে চেয়েছি।"
বিশ্লেষকদের মতে, এই 'ভালো গণহত্যা-খারাপ গণহত্যা' তত্ত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। এখন থেকে যুদ্ধাপরাধী বা গণহত্যাকারী কেউই আর 'অপরাধী' নন, বরং তাদের 'ভালো-মন্দ' বিচার করবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এই ফর্মুলা সফল হলে, আগামীতে যেকোনো সন্ত্রাসী বা যুদ্ধাপরাধী 'প্রেক্ষাপট ভালো ছিল' বলে নিজেকে খালাস করিয়ে নিতে পারবেন।
নীল দর্পণের পক্ষ থেকে আমরা এনসিপির কাছে অনুরোধ রাখছি—একটু স্পষ্ট করে বলে দিন, কোন সালের গণহত্যা 'ভালো', কোনটার জন্য শোক প্রস্তাব দেওয়া যাবে, আর কোনটার জন্য দেওয়া যাবে না। তাতে সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারবেন, কাদের জন্য নীরবতা পালন করবেন আর কাদের জন্য 'কিলার' স্লোগান দেবেন।