ঢাকা - আজাদি, ইনকিলাব, বয়ান—শব্দত্রয়ীর মালিকানা নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যে তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়েছে, তা এখন এক চূড়ান্ত পরাবাস্তব রূপ ধারণ করেছে। মহান ভাষা আন্দোলনের এই মাসে একদল ভাষাপ্রেমী যখন এসব শব্দকে ‘বিদেশি’ ও ‘অ-বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিলের দাবি তুলছেন, তখন এই শব্দগুলোর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত-ই-ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির। তবে মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিকভাবে ‘ইনকিলাব’ বা ‘আজাদি’ শব্দগুলো উপমহাদেশে বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, বর্তমান জামায়াত নেতারা সেগুলোকে নিজেদের ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে দাবি করছেন।
এই অভাবনীয় জোটবদ্ধতার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, শিবিরের কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকরা এখন প্রকাশ্যেই অতীতের কট্টর বামপন্থী নেতাদের শব্দচয়ন ও অলংকার শাস্ত্রের প্রশংসা করছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে জনৈক নেতা জানান, "ইনকিলাব মানে বিপ্লব, আর বিপ্লব মানেই পরিবর্তন। উপমহাদেশে বামপন্থীরা এটা ভুলভাবে ব্যবহার করেছে ঠিকই, কিন্তু আমরা এখন এই শব্দটিকে ওজু করিয়ে পবিত্র করে নিয়েছি। তারা একে ব্যবহার করত মেহনতী মানুষের জন্য, আমরা করছি মাটির নিচে থাকা আমাদের অদৃশ্য শিকড়ের জন্য।"
এই 'শিকড়' বলতে তারা আসলে কী বোঝাতে চাইছেন, তা স্পষ্ট হয় সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের এক নেতার বক্তব্যে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "অনেকে আমাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক চুরির অভিযোগ আনছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা স্রেফ ভাষার আরবিয়করণ (Arabaisation) করছি। সাধারণ মানুষের বোঝা উচিত যে, আমরা আসলে এই দেশের আদি অধিবাসী নই। আমাদের পূর্বপুরুষরা উটের পিঠে চড়ে সরাসরি আরব থেকে এখানে এসেছিলেন। সুতরাং আরবি-ফারসি ঘেঁষা শব্দ ব্যবহার করা আমাদের জন্য কোনো রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং এটি একটি ডিএনএ-গত তাগিদ। আমরা স্রেফ আমাদের পৈতৃক ভিটায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছি।"
এদিকে, উপমহাদেশের বামপন্থী দলগুলো তাদের দীর্ঘদিনের লালিত ‘ইনকিলাব’ শব্দটি এভাবে ‘দাড়ি-টুপি’ পরে আত্মপ্রকাশ করায় তীব্র বিভ্রান্তিতে পড়েছে। তাদের দীর্ঘদিনের স্লোগান এখন অন্য পক্ষের কণ্ঠে শুনে অনেকে একে ‘মতাদর্শিক হাইজ্যাক’ বললেও জামায়াত সমর্থকরা একে দেখছেন ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ হিসেবে। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু বামপন্থীরা এখন ক্ষয়িষ্ণু, তাই তাদের ব্যবহৃত শক্তিশালী শব্দগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন ‘ঈমানদার’দের হাতেই মানায়।
এ বিষয়ে বাংলা একাডেমি থেকে মন্তব্য চাওয়া হলে তারা "বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে" এবং "ভাষা একটি প্রবহমান নদী" শীর্ষক একটি অত্যন্ত জেনেরিক এবং অর্থহীন বিবৃতি প্রদান করে ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। একাডেমির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "ফেব্রুয়ারি মাসে এমনিতেই অনেক চাপ থাকে, তার ওপর এই ‘ইনকিলাব’ বাম না ডান—তা নিয়ে গবেষণা করার মতো সময় আমাদের নেই। আমাদের কাজ হলো শুধু বইমেলা করা।"
তবে নীল দর্পণের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই ভাষাগত পরিবর্তনের ঢেউ এতটাই প্রবল যে, নিভৃতে অনেক শিবির কর্মী এখন মাও সে তুং বা চে গুয়েভারার ভাষণের অনুবাদ পড়ছেন—কেবল শব্দগুলো সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তাদের বিশ্বাস, শব্দের উৎস যা-ই হোক না কেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি ‘আরবীয় শিকড়’ হয়, তবে মার্ক্সবাদী পরিভাষা ব্যবহার করাও এক প্রকার ‘সাওয়াব’-এর কাজ।